সৌদিতে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে ৫ লাখ বাংলাদেশি

সৌদি আরবে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা ও সৌদিকরণ নীতির ফলে সেখানে কর্মরত

প্রবাসীদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এতে সেখানে অবস্থানরত ১৫ লাখ

শ্রমিকের মধ্যে অর্ধেকের বেশি অবৈধ বা বেকার হয়ে পড়েছেন। গত দুই বছরে সৌদিতে

৩৯টি পেশার প্রবাসী নিয়োগের বিধিনিষেধের ফলে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেড়

লাখের বেশি শ্রমিক বেকার হয়ে বাংলাদেশে ফিরেছেন।

‘অবৈধ শ্রমিকমুক্ত সৌদি’ কর্মসূচির আওতায় ২০২১ সালের মধ্যে আরও অন্তত ৫ লাখ

শ্রমিক দেশে ফিরে আসবেন। ভবিষ্যতে ফ্রি ভিসা নামে আর কেউ যাতে সৌদিতে যেতে

না পারে সেজন্য কঠোর নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। সৌদি আরবে অবস্থানরত শ্রমিকদের

বর্তমান দুরবস্থা এবং তাদের দেশে প্রত্যাবর্তন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ

গোপনীয় প্রতিবেদনে এসব উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে।

সৌদির এ সমস্যা উত্তরণে বেশ কয়েকটি সুপারিশের মধ্যে রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ইসু্যটিকে

সামনে এনে শ্রমিকদের উপর আরোপিত বিভিন্ন বিধি-নিষেধ ও ট্যাক্স থেকে অব্যাহতির

জন্য সৌদি সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও ফ্রি

ভিসা নামে যেসব ট্রাভেল এজেন্সি বেকার যুবকদের বিপদের পথে ঠেলে দিয়েছে তাদের

চিহ্নিত করে কালো তালিকাভুক্ত করে লাইন্সেস বাতিল করতে পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ

বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের

পরিচালক-১২ মোহাম্মদ মমিনুল রহমান স্বাক্ষরিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে

সৌদি আরবে প্রায় ১৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি বিভিন্ন পেশার কাজ করছেন। সৌদি

সরকারের ইকামা (রেসিডেন্ট কার্ড/ওয়ার্ক পারমিট) ফি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক মন্দাসহ বিভিন্ন

কারণে ইকামা নবায়ন করতে না পারায় বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ বেকার হয়ে

পড়ছেন।

অনেকে বর্ধিত ইকামা ফি পরিশোধের জন্য নিজ পেশা বাদ দিয়ে অন্য পেশায় চলে

যাচ্ছেন, যা সৌদি আইনে অবৈধ ও দন্ডনীয় অপরাধ। আবার অনেকে বাংলাদেশ থেকে

ফ্রি ভিসায় সৌদি আরবে গিয়ে কফিল (স্পন্সর) \হবা কাজ খুঁজে না পেয়ে বিপদগ্রস্ত হয়ে

পড়েছেন। এ ধরনের প্রবাসী বাংলাদেশিরাই সৌদি আরবে বেশি যারা বাংলাদেশে ফেরত

আসতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদিতে চলমান বেকারত্বের কারণে

২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে ১২টি, ২০১৮ সালের মার্চে ৮টি এবং এপ্রিল মাসে ১৯টিসহ

মোট ৩৯টি পেশায় প্রবাসীদের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সৌদি সরকার।

২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে প্রথম দফায় ঘড়ি, চশমা, হাসপাতাল সামগ্রী, বৈদু্যতিক

যন্ত্রপাতি ও বিদু্যৎ চালিত সামগ্রী, গাড়ির যন্ত্রাংশ, আবাসন উপকরণ, কার্পেট, গাড়ি ও

মোটরসাইকেলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গৃহ ও অফিস আসবাবপত্র, বাচ্চাদের কাপড় ও

পুরুষদের আনুষঙ্গিক জিনিস, গৃহস্থালি তৈজসপত্র ও কনফেকশনারি দোকানে ১২টি

পেশায় প্রবাসীদের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

এরপর ২০১৮ সালের মার্চ মাসে সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের আরেক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে

আরও ০৮টি পেশায় যেমন- ট্রাক ও উইন্স (লরি) ড্রাইভার, জীবন বিমা কোম্পানি ও ডাক

যোগাযোগ, বেসরকারি গার্লস স্কুলের কর্মকর্তা ও শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শপিংমলে প্রবাসী

নাগরিকদের নিয়োগ বন্ধ করে।

সর্বশেষ ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আরেকটি প্রজ্ঞাপনে-সিনিয়র

মানবসম্পদ পরিচালক, কর্মী পরিচালক, শ্রমবিষয়ক পরিচালক, জনসংযোগ কর্মকর্তা,

কর্মী ব্যবস্থাপক, কর্মচারী ডিউটি লেখক, নিয়োগবিষয়ক কর্মকর্তা/কর্মচারী, স্টাফ

লেখক (সুপারভাইজর), টাইম রেজিস্টার সংরক্ষক, জেনারেল রিসেপশনিস্ট, হোটেল

রিসেপশনিস্ট, রোগী রিসেপশনিস্ট, বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ গ্রহণকারী,

কোষাধ্যক্ষ, নিরাপত্তারক্ষী, সরকার সম্পর্কিত কর্মকর্তা, চাবি তৈরি বা মেরামতকারী,

কাস্টমস্‌ কর্মকর্তা/কর্মচারী এবং নারী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা/কর্মচারী- এ

১৯ ক্যাটাগরিতে প্রবাসীদের উপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় এসব পেশায় বাংলাদেশী প্রবাসী বেশি কর্মরত থাকায় বেকারত্ব

হওয়ার হারে তারাই বেশি। এ ছাড়াও বিভিন্ন পেশায় প্রবাসীদের ইকামা ফিও বাড়ানো হয়।

ফলে চাকরি হারিয়ে অনেক বাংলাদেশি দেশে চলে ফেরত আসতে বাধ্য হচ্ছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইকামা ফি বাড়ানো, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সৌদিকরণ

নীতির ফলে প্রবাসীরা একদিকে যেমন বেকার হয়ে পড়ছেন অপরদিকে বর্ধিত ইকামা

ফি পরিশোধ করতে না পেরে ইকামা নবায়ন করতে পারছেন না।

এ অবস্থায় বর্তমানে প্রায় ৫০% প্রবাসী বাংলাদেশির ইকামার মেয়াদ নেই, ফলে তারা

অবৈধভাবে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। এসব প্রবাসী বাংলাদেশি সৌদি পুলিশের

অভিযানে আটক হয়ে প্রতিনিয়তই বাংলাদেশে ফেরত আসছেন। এছাড়া ইকামার ফি

পরিশোধের জন্য অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি কম বেতনে ব্যবসাসহ বিভিন্ন অননুমোদিত

পেশায় কাজ করার কারণে ইকামার মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও তাদের আটক করে বাংলাদেশে

ফেরত পাঠাচ্ছে সৌদি পুলিশ।

অনেকেই কোম্পানির ৮ ঘণ্টা কাজ শেষে অন্য কোম্পানি বা কোনো ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানে

কাজ করতে গিয়েও পুলিশের নিকট আটক হচ্ছেন। ইতোমধ্যে সৌদি আরব থেকে

২০১৮ সালে ৩৭ হাজার ৮৪৯ জন এবং ২০১৯ সালে ৩১ হাজার ৬০৫ জন বাংলাদেশি

সৌদি পুলিশের কাছে আটক হওয়ার পর ডেপুটেশন ক্যাম্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে

ফেরত এসেছেন। এছাড়া, স্বেচ্ছায় কফিল (স্পন্সর) এর মাধ্যমে ফাইনাল এক্সিট নিয়ে

২০১৭ সাল থেকে বহু বাংলাদেশি সৌদি আরব হতে দেশে ফেরত এসেছেন।

প্রতিবেদনে আরও উলেস্নখ করা হয়েছে, কিছু অসাধু আদম ব্যবসায়ী সৌদি আরবে

বাংলাদেশ দূতাবাস ও কলেটের প্রত্যয়ন ছাড়াই প্রবাসী মন্ত্রণালয় থেকে ভিসা এটাস্টেশন

করে হাজার হাজার লোককে সৌদি আরবে পাঠাচ্ছে। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে

ফ্রি ভিসার নাম করে বেকার যুবকদের সৌদি পাঠানো হয়। তারাই সৌদিতে এসে

কফিলকে (স্পন্সর) খুঁজে না পেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।

কিছুদিন মানবেতর জীবন কাটানোর পর নিজেই সৌদি পুলিশের কাছে ধরা দিয়ে দেশে

ফেরত আসছেন। সমস্যা উত্তরণে গোপনীয় প্রতিবেদনের বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা

হয়। তার মধ্যে সৌদি আরবে শ্রমিক পাঠানোর আগে দেশটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ

দূতাবাস কর্তৃক (স্পন্সর) ও কাজের পরিবেশ, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য বিষয়াদির খোঁজ

নেয়া এবং এ বিষয়ে দূতাবাসের প্রত্যয়নপত্র অবশ্যই নিতে হবে।

যেসব ট্রাভেল এজেন্সি সরকারের আইন ভঙ্গ করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা

নেয়া এবং ইতোমধ্যে যেসব এজেন্সির মাধ্যমে শ্রমিক সৌদি আরবে যাওয়ার পর

বিপদগ্রস্ত হয়ে দেশে ফেরত এসেছেন সেসব এজেন্সিকে কালো তালিকাভুক্ত করে

লাইসেন্স বাতিল করা। এছাড়া সৌদি আরবে প্রবাসীদের বর্তমান দুরবস্থা নিয়ে বিভিন্ন

প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে সচেতন করা, বিশেষ করে ফ্রি

ভিসায় যাতে কেউ না যেতে পারে সে বিষয়ে প্রচারণা চালাতে বলা হয়।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হওয়ার পরও মিয়ানমার থেকে ১০

লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। সুপারিশে

আরও বলা হয়- এ বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সৌদি

সরকারের আরোপিত বিভিন্ন বিধি-নিষেধ ও ট্যাক্স হতে অব্যাহতি পাওয়ার বিষয়ে

কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

উৎসঃ যায়যায়দিন

Updated: 15/03/2020 — 7:29 PM